দোর্দন্ত-প্রেম !

/দোর্দন্ত-প্রেম !
দোর্দন্ত-প্রেম !2018-09-04T02:01:44+00:00

আমার বরের দাঁত গুলো  ঠিক চাষের জমিতে  লাঙ্গল চালানোর পরের মাটির মতো।  প্রাক -বিবাহ সোহাগে গদগদ পর্বে যেদিন  প্রথম তার মা  একমুখ হেসে বলেছিলেন “ওমা! তোমার কথা তো খুব শুনেছি  বাবুর মুখে , আজ আলাপ হলো! “, সেদিনই  কত্তাবাবুর  দাঁত -রহস্য আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো।  ওটা জন্মসূত্রে অর্জিত সম্পদ। গুরুজনদের আমি খুবই সমীহ করে চলি, তবু  সেই অপূর্ব দন্ত-সৌন্দয দেখে  হবু বৌমার স্বাভাবিক ব্রীড়াবনত মুখে আমি প্রথমেই ফিক করে হেসে ফেলেছি।  তবে ওই এবড়োখেবড়ো দাঁত না থাকলে হয়তো আমার জীবনটাই অন্যরকম হতো।  কিভাবে? তাহলে বলি।

আমি কুহু, ভালো নাম সৌভাগ্যলেখা। এই নামের বানান শিখতে আমার প্রায় ছয় বছর লেগেছিলো জন্মের পর। একেই মেয়ে, তার উপর জন্মের পরই কুচকুচে কালো শিঙিমাছের বাচ্চার মতো আমাকে দেখে আমার দুধসাদা হুরীপরী মায়ের মনের অবস্থা কি হয়েছিল তা নিয়ে বেশী গভীর আলোচনায় না যাওয়াই  ভালো। তাই সমাজ সংসারকে বুড়ো আঙুল দেখানোর যুদ্ধের প্রথম ধাপ হিসেবে  মা এই সৌভাগ্যলেখা  নাম বেছে নিলেন বোধহয়। ভাবখানা এমন যে এই মেয়েই আমার সৌভাগ্য বয়ে আনবে। হায় রে!একবার ভেবেও দেখলেন না আমার জন্য কি দুর্ভাগ্য বয়ে আনলেন! কোনো মেয়েকে যদি এই নাম মানুষ কে বলে বোঝাতে হয় তার বেদনা এই হতভাগ্য আমি ছাড়া আর কারো পক্ষে বোঝা অসম্ভব। তার মধ্যে ভগবানের কি খেলা, বেচারা আমি তালেগোলে এসে পড়লাম বিদেশে, আমার নামটা  যাকেই বলি, প্রথমেই তার যে অবস্থা হয় ইংরিজিতে তাকে বলে ‘প্রিপ্লেক্সড’। বানান করে যতক্ষনে তাকে বোঝানো হয়, সে বেচারা হতাশ হয়ে স্থান ত্যাগ করে নয়তো ফোন রেখে দেয়। ছোটবেলায়  অনেক চেষ্টা করেছিলাম, সরকারি কাগজপত্রে যাতে নাম তা বদলানো হয়, জেহাদ ঘোষণা করে একদিন মাথার এক খাবলা চুল উঠিয়ে ফেললাম, একদিন খুব চেষ্টা করলাম আলমারীর চাবি খুঁজে জন্মের প্রমান পত্রে লাল কালী দিয়ে নামটা কেটে দেবার, শেষে একটানা পাঁচ দিন ‘ভাত’ খেলাম না, যা আমার কাছে অমৃতসম। কিন্তু কোনোকিছুতেই কোনো কাজ হলো না,  মাতৃদেবী অচল অনড় -এই নামই বহাল থাকবে। শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে ভালো করে ভেবে একটা ফর্মুলা আবিষ্কার করলাম সহজে লোককে বোঝানোর জন্য। প্রথম থেকেই বানান করে বলা শুরু করতাম, প্রতিটা অক্ষর দিয়ে একটা করে চেনা শব্দ বলে।

যুদ্ধের পরের ধাপে মাতৃদেবী আমার অমন কষ্টিপাথরের মতো রং ঘষে মেজে ম্যাজিক সাদা করে ফেলেছিলেন। ইটালিয়ান অলিভ অয়েল এর ব্যবসা আমার মায়ের মতো অনুগত ক্রেতা আরো কিছু থাকলে অবশ্যই আইফোনকে টেক্কা দিতে পারতো আমি বাজি ধরতে পারি। তা নামকরণ পর্বের সময় ভগবান বোধহয় অলক্ষে মুচকি হেসেছিলেন, ভাবলেন এমন দাঁতভাঙ্গা নাম  যার, কেন না তার দাঁতগুলোতে একটু কারুকার্য করে দিই? সুতরাং যতই বড়ো হতে লাগলাম ততই আমার দাঁতও উঁচু হতে থাকলো, কিছুদিন পর তারা মুখের বাঁধন ছেড়ে বাইরে আসার জন্য ছটফট করতে শুরু করতেই ব্যাপারটা মা এর দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। তিনি একজন শহরের সেরা দন্তবিশেষজ্ঞের কাছে আমাকে নিয়ে গেলেন। প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা বলি। আমার বয়স তখন বছর পাঁচেক হবে।  তিনটি ঘন্টা বাইরে অপেক্ষা করার পর আমার ডাক পড়লো। দু ঘন্টার মাথায় আমি শান্তভাবে চেম্বারের বাইরে গিয়ে নতুন কার্পেটটার ডানদিকের কোণাটা চিরে চিরে বেশ সুন্দর একটা নক্সা করে দিয়েছিলাম। শেষ করতে পারিনি আফসোস রয়ে গিয়াছে, আমার নাম ডাকছে শুনলাম ভেতর থেকে বেশ চিকণ গলায়।  ডাক্তারখানাটা দুশো বছরেরও পুরোনো যতই নতুন কার্পেট বিছাক না কেন । বিচ্ছিরিমত অন্ধকার একটা ঘরে ঢুকেই দেখি ইয়াব্বড় একটা চেয়ার বসানো, তাতে অনেক কলকব্জা লাগানো। বাঁদিকে একটা বেসিন, বসলে গায়ের উপরে এসে পড়বে! যুক্তি হলো, দাঁত পরীক্ষার পর রোগী থুতু ফেলতে পারবে চেয়ারে বসেই। ওই চেয়ারে আমাকে ডাক্তারবাবুর একজন এসিস্টেন্ট চেপে বসিয়ে দিয়ে মুখ হা করিয়ে দিলো। সামনে একটা দেওয়াল এর গায়ে গরম জল ফুটছে, আর তাতে অনেক যন্ত্রপাতি বসানো। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হলো একটা অতি জোরালো এল এতক্ষন অন্যদিকে ফিরিয়ে নেভানো ছিল, হা করিয়ে ওই আলোটা আমার মুখের উপর জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। কিছুই চোখে দেখতে পারছি না।  ত্রিশ সেকেন্ড পরে আলোটা একটু চোখ সয়ে এলে দেখলাম ডাক্তারবাবু এগিয়ে আসছেন, একটা বিকট হাসপাতাল সবুজ এপ্রন পরনে, মাথায় একটা ওই রঙের টুপি, মুখ ঢাকা ওই রঙের মাস্কে, হলদেটে সাদা গ্লাভস পরা ডান হাতে একটা ইনজেকশন উঁচিয়ে ধরে। দেখেই আমার মাথা ঝিমঝিম করে হিসু পেয়ে গেলো, কিছু বলার আগেই আমি চোখ বন্ধ করে গলা ফাটিয়ে আ আ করে চিৎকার জুড়ে দিলাম। তা ইনি  আবার আমার পরম পূজনীয় দাদুভাই এর বন্ধু, যেমন দাদু তেমন বন্ধু, মানুষ কে নাস্তানাবুদ করার জন্যই জন্মেছে। চিৎকার করতে করতেই শুনতে পেলাম তিনি মাস্কের মধ্যে থেকে গুমগুম করে বলছেন “নাতনী, এটায়  জল আছে, মুখে স্প্রে করে মুখ পরিষ্কার করার জন্য, চোখটা খুলে দ্যাখ!” আমি একটা চোখ একটু  দেখলাম সত্যি সুঁচটা তো নেই মাথায় লাগানো, কিন্তু হঠাৎ থেমে তো যাওয়া যায় না, তাই  ফোঁপানো চালু রেখে চুপ করে গেলাম। ইনজেকশন এর সিরিঞ্জে করে কেউ কুলি করার জল আনে বাপের জন্মে কেউ শুনেছে কি? স্প্রে করে আমার মুখের মধ্যে ভালো করে পরীক্ষা করে তিনি মা জননীর কাছে ঘোষণা করলেন, “দাঁতের মাড়িটা তোর মেয়ের জন্ম থেকেই উঁচু, দুধে দাঁত পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্লিপ লাগাতে হবে নিচু করার জন্য, কিন্তু পোকায় খাওয়া দাঁত গুলো তো তুলতে হবে তার আগে। প্রতি দুই সপ্তাহে ওকে একবার দেখিয়ে নিয়ে যাবি, দশ বছর বয়স পর্যন্ত সময় লাগবে। আমি ফিক্সড ক্লিপ দিচ্ছি না, নাতনির কষ্ট হবে, খাওয়ার সময় খুলে রাখবে এমন ক্লিপ করে দেব। আর ওকে এখানে  আনার দরকার নেই, এরপর থেকে বাড়িতে নিয়ে আসিস, ওর দিদা আছে , দরকার হলে দেখতে পারবে। কিন্তু আজ একটা পোকায় খাওয়া দাঁত  যে তুলতে হবে মা, তার জন্য মাড়িতে একটা ইনজেকশন দিতে হবে!” অমনি আমার বিনয়ের অবতার মা গলে পড়ে  বললেন “হ্যাঁ হ্যাঁ কাকু, যা ঠিক মনে হবে তাই করুন!” এবার শুরু হলো আসল খেলা, সত্যি করে ইনজেকশন দেবার পালা, মুখের মধ্যে। ভগবান বলে কেউ যে নেই সেদিন আমি বুঝেছিলাম, ওই আওয়াজ যদি তার কানে না পৌঁছয়, তার মানে সে নেই ই! বাইরে যেসব রোগীরা বসেছিলেন, তারা অনুমতি  না নিয়েই ঘরে ঢুকে এসেছিলেন, “ডাক্তারবাবু, সব ঠিক আছে তো?” পেছন থেকে আমার মা দুটো হাত পিছমোড়া করে ধরে, বদমাস কম্পউণ্ডার তা মুখটা  টিপে ধরে, এবং পা দুটো ডাক্তারবাবু ঠেসে ধরে আমার প্রথম দাঁতটা ওপড়ানো হয়েছিল। চ্যাঁচিয়ে চ্যাঁচিয়ে ক্লান্ত হয়ে গিয়ে যখন শুধু ফোঁপাচ্ছিলাম, তখন আবার ন্যাকামো করে ওই হাড়বজ্জাত কম্পউণ্ডার আমাকে একটা আইসক্রিম এনে দিয়েছিলো। সেদিন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম বাকি যেকটা দাঁত আছে সেগুলো দিয়ে ওই দাঁতের দাদু আর কম্পউণ্ডার ব্যাটাকে কড়মড়িয়ে চিবিয়ে খাবো। দুঃখ হলো, এই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে আমাকে পরবর্তী জীবনে বহুবার যেতে হয়েছে, এবং যে দাঁত গুলো দিয়ে চিবিয়ে খাবো ঠিক করেছিলাম সবই ওই দুজন টেনে টেনে তুলেছে। প্রতিবারই একটা করে আইসক্রিম পেয়েছি হাসিমুখের সঙ্গে। কোনোদিন মনে হয়নি, আমার যন্ত্রনা সামলাতে গিয়ে কতখানি বেশি সময় দিতে হয়েছে ওই ব্যাস্ত ডাক্তারদাদু আর ওই গরীব কম্পউণ্ডার ছেলেটিকে, প্রতিবার কয়েকজন রোগী কম দেখে – যেন ওটা আমার প্রাপ্য। ভালোবাসা ঈশ্বর কত বিচিত্র উপাদানে  ছড়িয়ে রাখেন। তবে এই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত আমারই জয় হয়েছিল, নাতনির প্রতি দয়ালু হয়ে যে ক্লিপ ডাক্তারদাদু খালি খাবার সময় খুলে রাখতে দিয়েছিলেন, কার্যক্ষেত্রে দেখা গেলো সেটা বেশির ভাগ সময়ই খুলে রাখা হয়েছে, ফলে কয়েকটা দাঁত তুলে যে জায়গাগুলো  করা হয়েছিল উঁচু দাঁতেরা ক্লিপের মাধ্যমে নিচু হয়ে ভরিয়ে দেবে বলে, অন্য দাঁত বাঁধনছাড়া ইচ্ছে খুশি মতো জায়গা পেয়ে সে জায়গা ভরিয়ে জমিয়ে বসলো। আমিও বড়ো হলাম, পড়াশোনার  চাপে আমার মা জননী দন্তযুদ্ধ আর চালিয়ে যেতে পারলেন না।

কিন্তু আর একটু বড়ো হতেই আমার দাঁত উঁচু এই ব্যাপার তাই বেশ একটা হীনমন্যতা কাবু করে ফেলতে লাগলো। চারিদিকে সব্বার কত বয়ফ্রেইন্ড আছে, আমার মতো দাঁত উঁচু মেয়ে বোধ হয় খুবই কুচ্ছিত, কেউ বিয়ে করবে না। মাসি পিসিদের বিয়ে হয় তো দেখি, কত গয়না পরে, হাতে পায়ে আলপনা দিয়ে, ওদের তো দাঁত উঁচু নয়  আমার মতো। নিন্দুকেরা সোহাগ দেখিয়ে বলতো আহা রে, মেয়েটার সব এ ভালো, খালি দাঁতটা একটু  … আমি ভাবলাম, নাহ , বিয়ে না হলে অনেক লস, কত গয়না, জিনিসপত্র, কিচ্ছু তো পাওয়া যাবে না।  দাঁতের দাদুর কাছে গেলাম, তিনি মাথা নেড়ে বললেন, “এমন কিছু দাঁত উঁচু নয়, আমার এমন সুন্দর এমন গুণী নাতনির জন্য জামাই এমনিই  পাওয়া যাবে, এই বুড়ো বয়সে আর নিচু হবে না দাঁত!” মনের দুঃখে বাড়ি ফিরে বেশ একটু কেঁদে নিলাম। ধরেই নিলাম আমাকে কেউ বিয়েই করবে না। ভয়ে ভয়ে বেশী  বেশী  পড়াশোনা করতে লাগলাম। আস্তে আস্তে জ্ঞানের তৃষ্ণা এমনই  বেশি হয়ে পড়লো, ঠিক করলাম দেশে আর কুলোচ্ছে না, বিদেশে পাড়ি দেবো। সেইমতো প্রস্তুতি নিতে থাকলাম, সুযোগ এসে গেলো, একদিন প্রচুর অশ্রু বিসর্জন সহকারে সবার থেকে বিদায় নিয়ে আমেরিকাগামী বিমানে চড়ে বসলুম। সে দেশ কি আর এখানে, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে, দু তিনবার বিভিন্ন শহরে বিমান পাল্টে যেতে হয়। প্রথম বিমানে ছোড়ে বসতেই ধুম জ্বর, বিমানসেবিকা ওষুধ দিয়ে আমাকে শুইয়ে দিয়ে গেলো। দ্বিতীয় বিমানে ওঠার সময় ও আমি বেশ কাহিল। এর পর আছে তৃতীয় বিমান। সব চেয়ে বেশি সময় নেবে এই দ্বিতীয়টি। জানালার ধরে সিট পেলুম, পাশের সহযাত্রী গম্ভীরমুখে অতি সুদর্শন যুবক।আমার মনে তো ফুল ফুটছে।  কিন্তু তিনি কমলা রঙের অতি উচ্চশ্রেণীর একটি চশমায় চোখ ঢেকে একটি ইউটিউবে ভিডিও দেখতে ব্যস্ত। উসখুস করছি, একটু আড়চোখে দেখতে চেষ্টা করলুম কি জিনিস এতো মনোযোগ দাবি করছে , দেখলাম একটি অতি সুন্দরী মেয়ে  একটা ক্যামেরার মতো জিনিস হাতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আর হেসে হেসে কি সব বলছে।  ওহ ,তাহলে এই ব্যাপার, মেয়ে দেখা হচ্ছে। বেশ গা জ্বলে গেলো। এতো কিসের দেমাক , সহযাত্রীর সঙ্গে ভদ্রতা করেও তো দুটো কথা বলা যায় ! যাকগে, আমার কি, আমিও ঘ্যাম নিয়ে থাকবো। বাইরের দিকের সিট এ একজন বিশালবপু  মার্কিন সাহেব উঠেই মুখ হা করে ঘুমোতে শুরু করেছেন। কি আর করা, একটাই কাজ এখন খাবারের অপেক্ষা করা। পুতুলসুন্দরী বিমানসেবিকা খাবার দিয়ে গেলো, সামনের সিটের পেছনে ভাঁজ করে রাখা ছোটো টেবিল খুলে সবাই খাবার খুলতে শুরু করলো।  ছোট ছোট বাটিতে পরিপাটি করে সাজানো চমৎকার খাবার। আমার কোনো কিছুই তো মসৃণভাবে হয়না, অনেক টানাটানিতেও সামনের ভাজকরা টেবিল কিছুতেই খুলছে না। সামনে বিমানসেবিকা খাবারের ট্রে হাতে হাসিমুখে অপেক্ষা করছে আর মনে মনে আমার কান্ড দেখে তাচ্ছিল্য করছে। এবার দেখলাম বাবুর টনক নড়লো , “আমি কি সাহায্য করতে পারি?” বলে আমার টেবিলটা খুলে দিলেন। আমিও একমুখ হেসে বললাম “ধন্যবাদ। আমি সৌভাগ্যলেখা।” ভুরুতে সামান্য ভাঁজ পড়লো, তিনি বললেন “মাপ  করবেন, নামটা কি বললেন, সৌভাগ্যঅঅ ..??” হঠাৎ সেই মার্কিন সাহেব বিমানসেবিকার ডাকে ধড়মড় করে জেগে উঠতে গিয়ে কনুই দিয়ে এনাকে দিলেন ধাক্কা ও নিজে ধপ করে পাশের দিকে মাটিতে পড়ে  গেলেন সুন্দরীর হাতে ধরা আমার খাবারের প্লেট সুদ্ধ এবং “লেখা” বলতে পারার আগেই এনার মুখ থেকে সাদামতো কি একটা টুপ্ করে খসে পড়লো সামনের স্যুপের বাটিতে। হতভম্ব ভাবটা অতি দ্রুত কাটিয়ে উঠে চমৎকৃত হয়ে আবিষ্কার করলুম ওটা মশায় এর একটা দাঁত! অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত সভ্য একটি মেয়ে আমি, সহমর্মিতা আমার যথেষ্টই আছে, কিন্তু প্রতিবর্ত ক্রিয়া বলেও তো একটা জিনিস আছে! প্রথমেই আমি হো হো করে অট্টহাস্য করে উঠলাম। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই আবার সামলে  নিয়ে আড়চোখে চেয়ে দেখি বিমানসেবিকা মেয়েটিরও ঠোঁটের কোনায় মুচকি হাসি।  সাহেব তো খুব মাথা নেড়ে ক্ষমা চাইছেন, ইনি মাথা ঝুঁকিয়ে গভীর মনোযোগে স্যুপের বাটিতে কি যেন খুঁজে যাচ্ছেন, আমার পক্ষে এ দৃশ্য দেখে হাসি চাপা দুষ্কর হয়ে যাচ্ছে। এমন সময় তিনি সটান মাথা তুলে বললেন “আপনি কি এরকমই ফাজিল প্রকৃতির ?” বলেই সবকটা দাঁত বের করে হাসলেন। আমি যে কি বলবো, এরকম ও মানুষের দাঁত হতে পারে? প্রতিটার সঙ্গে প্রতিটা যুদ্ধ করছে, সম্পূর্ণ এবড়োখেবড়ো সারি, কোনার দিকে একটি তার মধ্যে হেরে গিয়ে স্যুপের বাটিতে আত্মসমর্পণ করেছে, তার জায়গাটা ফাঁকা, তা সত্ত্বেও  হাসলে দুপাশে দুটি গজদাঁত ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে। আমি পুরো ক্লিন বোল্ড। আমার উপযুক্তও কাউকে ভগবান বানিয়েছেন তাহলে।

বলা বাহুল্য, অতি শীঘ্রই  এনার বাহুলগ্না হয়ে আমাকে এদিক ওদিক দেখা যেতে লাগলো। প্রকৃতির নিয়মে একসময় একসঙ্গে থাকা হবে ঠিক করা হলো। যথারীতি বাড়িতে জানাজানির পর্ব, ফোনে কথা বলাবলি পর্ব, প্রথম অপরপক্ষকে দেখা দেওয়ার  জামার রং নিয়ে ঝগড়া পর্বের শেষে এলো আসল দেখা করার পর্ব।  এ পর্বের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ফিটফাট সেজেগুজে  ‘ইস্মাইল’  করে যেতে হয়। আর সেখানেই  হবু শাশুড়ি মায়ের ঢেউখেলানো দাঁতের ‘ইস্মাইল’ দেখে আমার ফাজিল মা হেসেই গড়াতে থাকলো  ‘ওরে, তুই ওবাড়ির বৌ হবার জন্যই জন্মেছিস !” হিহি! দেখলে গা পিত্তি জ্বলে যায় একেবারে! আমি কিন্তু খুব খুশি হয়েছিলাম,আড়চোখে কত্তাবাবুর মায়ের দুটো গজদাঁত দেখে ছেলের সঙ্গে দুম করে মাকেও বিচ্ছিরিরকম ভালোবেসে ফেলেছিলাম!  আর বিয়ের পর এই ভদ্রমহিলা  নরমে গরমে আমাকে যতখানি আদরে রেখেছেন, সে কথা শুরু করলে এ গল্প আর শেষ হবে না। খুব শিগগিরই আমাদের মাঝে একজন নতুন বিচ্ছু আসছেন, সবাই চাই সন্তান সুস্থ আসুক, আমি কিন্তু তার প্রথম দিন থেকেই তার দাঁত নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় আছি।

ঠাকুর ,দেখো !