কোলকাতায় থাকতে একসময় আমি একটি সংস্থার মাধ্যমে প্রাইভেট টিউশনি খুঁজতাম। আমেরিকায় আসার পর যা হয়, কাজের চাপে আর সেখান থেকে নাম কাটানো হয়নি। সুতরাং প্রায়ই তারা আমায় সাহায্য করার সহৃদয় চেষ্টা করে থাকে। সাধারণত আমি ইমেইল গুলো একবার হলেও খুলে দেখি মুছে ফেলার আগে, আর ভোর বেলা চোখ অর্ধেক খুলেই আর পাঁচজন এর মতো আমারও প্রথম কাজ হলো মেলবক্স খুলে দেখা কিছু দরকারি চিঠিপত্র আছে কিনা। এদেশে সময় এবং কথার দাম খুব, তাই মেলবক্স খুলে দেখাটা জরুরি। আজ ওই সংস্থার ইমেইল তা খুলে দেখতে চোখে পড়লো প্রায় পাঁচটা গৃহশিক্ষকের প্রয়োজন এর অনুরোধ , প্রতি জন এর এ বয়ান প্রায় একই – ইংরেজি মাধ্যম বা কনভেন্ট-এডুকেটেড সন্তান এর জন্য শুধুমাত্র ওই ধরণের জায়গায় পড়াশোনা করা শিক্ষকই চাই !

বিছানায় শুয়ে শুয়েই হাসি পেলো খুব, আমি তো যোগ্যতার মার্ক্স্ মাপকাঠিতে পাস্ মার্ক্স্ এর অনেক নিচে ! শুধু আমিই কেন, আমার সঙ্গে যে পড়াশোনা করেছে, চেনাজানা যেসব বিদগ্ধ মানুষেরা আছেন ‘পাঁতি বাংলা’ মাধ্যমে পড়াশোনা করা, তারাও বোধহয় তাই। আমার প্রাথমিক শিক্ষা বাংলা মাধ্যমে, শুধু প্রাথমিক কেন, পুরো স্কুলিংই বাংলা মাধ্যমে, এবং এইরকম স্কুলে ,যারা শিক্ষার মান (ইংরিজি ও তার মধ্যে পড়ে) ও নিয়মানুবর্তীতায় যে কোনো কনভেন্ট স্কুল কে দশ গোল দিতে পারে। এবং এই বাবামায়েদের অতি বিনয়ের সঙ্গে জানাচ্ছি আমি একটি আপাতত একটি দেশে আছি যেখানে আমার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এর একমাত্র সেতু হলো ইংরিজি ভাষা। আজ অবধি আমাকে কোনো মানুষের কাছে ইংরেজি মাধ্যম এ না পড়ার জন্য নিচু হতে হয়নি। আমার বাংলা মাধ্যমে পড়া বন্ধুদের মধ্যে একটা বৃহৎ অংশ পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছে, অতি সম্মানের সঙ্গে। আমার দেখা খুব কাছের একটি উল্টো উদহারণ হলো আমার বোন – ও জীবনের প্রথম থেকে শেষ আজ অবধি ইংরেজি মাধ্যম এ পড়েছে , কিন্তু ওর বাংলা ভাষার উপর দখল যে কোনো বাংলা মাধ্যম এ পড়া ছেলেমেয়ের থেকে কম নয়।

এরকম অসংখ্য উদহারণ আমি দিতে পারি, পরিবার এর বাইরে বেরিয়ে। কিন্তু সেটা আমার চিন্তার বিষয় নয়, আমার চিন্তা হলো অন্য জায়গায়। এই যে বাঙালি মা বাবারা ভাবছেন যে ইংরেজি মাধ্যম এ না পড়লে সে আপনার সন্তান কে পড়ানোর যোগ্য নয়, এই চিন্তা ধারা আমার ভয়। তারা নিজেরা হয়তো বাংলা মিডিয়াম এ পড়েছেন, বা হয়তো ইংরেজি মিডিয়াম এ পড়েছেন, কিন্তু সন্তান এর বেলায় শুধু ইংরিজি এ চান। কেন? লক্ষ্য করে দেখলে বোঝা যায় , এদের মধ্যে কেউ কিন্তু একবার ও বলেননি, এমন শিক্ষক চাই যে আমার সন্তান কে ঠিক মতো শেখাতে পারবে। এখানেই সমস্যা, আমরা নিজেরাই নিজেদের অসম্মান করছি, আর সেই বীজ সন্তান এর মধ্যে ঢুকিয়ে দিচ্ছি। যখন ওরা বলে “ওহ মাম্মা ! বেঙ্গলি ইজ সো ন্যাস্টি !” ওদের কোনো ধারণাই হয় না নিজেদের কতখানি অপমান করছে ওরা। শিক্ষার ভিত শক্ত হলে, ভাষা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। এখানে এসে ভারতের এ বিভিন্ন প্রদেশের মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ হয়েছে, আপনারা আপনাদের ছেলেমেয়েদের ঠিক যেরকম শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে চাইছেন তেমন ‘আধুনিক’ ভারতবাসী। কিন্তু বলতে অত্যন্ত লজ্জা হচ্ছে, একটি ক্লাস এ পড়াশোনায় তারা সব চেয়ে পিছনের সারিতে। এবং ঔদ্ধতে প্রথম সারিতে। আরবের লোকেদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, চীন, জাপান, আফ্রিকা, আমেরিকা তো আছেই। আমেরিকা বাদে বাকি দেশে প্রধানতঃশিক্ষার মূল মাধ্যম তাদের দেশের ভাষা , তারা ইংরেজি বেঁধে বেঁধে বলে কেউ কেউ, কিন্তু বুদ্ধি মেধা এবং মার্জিত ব্যবহার এর দিক থেকে তাদের কাছ থেকে অনেক শেখার আছে।

বাংলাদেশীরা কিন্তু এরকম নয় জানেন, তারা বাংলা ভাষাটাকে কি নিবিড় মমতায় ধরে রেখেছে , নিজে চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। পড়াশোনায় ও তারা কিন্তু আমাদের থেকে এগিয়ে। আর ইংরিজি উচ্চারণ? দু একজন এর ইংরিজি উচ্চারণ শুনে আমি প্রথমে ভাবতে পারিনি এদের জিভ আসলে বাংলা উচ্চারণে অভ্যস্ত। প্রতি দেশের লোকেদের মধ্যেই দেখেছি নিজেরদের দেশের প্রতি , নিজেদের ভাষার প্রতি কি গভীর প্রীতি ও ভালোবাসা, ব্যাতিক্রম শুধু ভারতবাসী, বাঙালি তো বটেই। কলকাতায় কিছু নেই, ভারতে সব খারাপ , এই হলো বক্তব্য। বড়ো কষ্ট হয় জানেন, গর্বের বদলে বুকে চিনচিনে ব্যথা হয় যখন খোদ ব্রিটিশ প্রফেসর বলেন “তোমার উচ্চারণ তো খুব ভালো, নিশ্চই তুমি খুব ভালো জায়গা থেকে এসেছো !” এই অভিজ্ঞতা আমার সঙ্গে আমার বন্ধুদের ও হয়েছে , বাঙালি নয় শুধু , অন্য প্রদেশের ছেলেমেয়েদেরও। আমাদের দেশের এক জায়গার ছেলেমেয়েরা অন্য জায়গার ছেলেমেয়েদের নিয়ে হাসি মজা করছে , অথচ যোগ্যতায় হয়তো তার ধরে কাছেও আসবার ক্ষমতা নেই।

কি শিখছি আমরা, কোথায় নিয়ে যাচ্ছি নিজেদের? দেখুন না, আপনি যদি নিজেকে সম্মান করতে পারেন, আপনার ছেলেমেয়েও পারবে ঠিক। আর তার সঙ্গে সঙ্গে অন্তঃসারশূন্য অধুনিক শিক্ষার বদলে হয়তো নিজেদের কে আরো সামান্য একটু ভালো মানুষ হিসেবে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরতে পারবে। তার পর চাইলে হয়তো, তার ছেলেমেয়েকেও মনুষ্যতের শিক্ষার এক ধাপ উঁচু সিঁড়িতে ছড়াতে পারবে। চেষ্টা করতে ক্ষতি কি, কি বলেন?