ববি প্রিন্ট

/ববি প্রিন্ট
ববি প্রিন্ট2018-09-04T03:17:08+00:00

ছোটবেলায় আমার খুব ফ্রক পরতে ভালো লাগতো।

আজকাল সব বাচ্চাদের দেখি প্যান্ট ,স্কার্ট,লেগিংস, কাটাকুটি, হিজিবিজি অনেক রকমের  বাহারি জামা পরতে , কিন্তু আমার ছোটবেলায় বাপু বাচ্চারা ফ্রকই পরত। অনেক বড় বয়স অবধি আমি ফ্রক পরেছি, রীতিমত বড়সড় হয়ে যাবার পরও। বন্ধুরা, মাসতুতো পিসতুতো দিদি বোনরা সব ততদিনে এক ধাপ উপরে সালোয়ার এ উঠে গিয়াছে, জিন্স টিনস ও পরছে মাঝে সাঝে, কিন্তু কেন জানি না আমার মা আমায় ফ্রকই পরাতেন , দর্জি র দোকান থেকে বানিয়ে টানিয়ে সে এক কান্ড।

আর সত্যি কথা বলতে আমারও ফ্রক পরতে বেশ ভালোই লাগতো, ওদের দেখে মনে হতো , ই: রাম! কি বড় হয়ে গেল ওরা জলদি জলদি , আমি বেশ ছোটই আছি এখনও বাবা ! বড় একবার হয়ে গেলে তো বড়ই থাকতে হবে সারাজীবন, তার চেয়ে যতদিন ছোট আছি বেশ মজায় আছি বাপু , অফিস যেতে হয়না, ঝগড়া করতে হয়না, রান্না করতে হয়না, মোটা মোটা বই পড়তে হয়না পরীক্ষার আগে দরজা এঁটে ! ছোট থাকার উপর আমার একটা চিরকালীন লোভ ছিল। তা যাই হোক, যা বলছিলাম, আমার ছোটবেলায় রেডিমেড জামাকাপড় খুব একটা হতো না, বড়জোর একটা , তাও পুজোয় অষ্টমীর রাতের জন্য স্পেশাল। বাকি সবই ছিট্ কাপড় কিনে বানানো হতো। আর আমার মা দারুন সুন্দর সুন্দর ফ্রিল ট্রিল দিয়ে জামা বানিয়ে দিতেন।

আমার বিশেষ পছন্দ ছিল ববি প্রিন্ট। বেশ ছোট তখন, দাদুর সঙ্গে গিয়াছি বাজার এ পুজোর কাপড় কিনতে। দোকান এ রোল করে করে অনেক রকম প্রিন্ট এর কাপড় রাখা আছে, সেখান থেকে একটা বেছে নিতে হবে। এই বেছে নেওয়া যে কি কঠিন কাজ ছিল আমার জন্য, সে শুধু আমিই জানি – সবই তো পছন্দ,কোনটা নেবো ! শেষ অবধি না পেরে অগত্যা আমাকে সেই অন্য কারোর মতে মত দিতেই হতো, কারণ বহু ঘন্টা মিনিট ধরে দোকানএ থেকেও আমি কিছুতেই শেষপর্যন্ত পছন্দটা ঠিক একটায় এনে ম্যাপ করে ফেলতে পারতাম না। তাই তখনকার মত সেটা কিনে আনলেও মনটা খুঁতখুঁত করতেই থাকতো। মা এর বকার ভয়ে কিছু বলতে পারতাম না। সে অভ্যেস আমার এখনো আছে, কিছুতেই দোকানে গিয়ে পছন্দটা করতে পারি না, অনেকখন ধরে অনেক বেছেবুছে একটা কিনলেও বাড়ি এসে ঠিক পাল্টাবই সেই।

তা সেদিনও বেরিয়ে দাদু তো খুব ইয়ারকি দিচ্ছে – কি দিদিভাই,একটাও পছন্দ হবে তো শেষপর্যন্ত? রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে! আমি মুখটা ঠিক হাঁড়ির মত করে দোকানে  ঢুকলাম।দোকানদার দাদুকে খুব খাতির যত্ন করে সরবত দিলো, সাথে আমাকেও, আমি তো দারুন খুশি। তার পরই শুরু হলো সেই নিদারুন ব্যপার – একটা করে রোল খুলছে ,আর সামনে মেলে ধরছে ,আমি অসহায় এর মত তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি শুধু – সবই তো সুন্দর! লাল-নীল-হলুদ-সবুজ ফুল-লতা-পাতা, একটা ব্যাঙ আর বেলুনও দেখলাম ! দেখতে দেখতে কাপড় এর পাহাড় জমে গেল সামনে। হঠাত কোণার দিকে দেখি একটা কাপড় এ সাদার উপর লাল লাল বড় বড় গোল গোল ছাপ , কি সুন্দর, একদম দিদার কপাল এর টিপটা বড় করে আঁকা । আমার এক দেখাতেই দারুন পছন্দ। দোকানদার কাকু বললেন মামনি নিয়ে যাও ,এর নাম ববি প্রিন্ট, ওই যে সিনিমা বেরিয়েছে না? জিনাত আমন পরেছে ,সে বই তো দারুন হিট। তার পর এই প্রিন্ট খুব চলছে – ববি প্রিন্ট !

তা সেই প্রিন্টই কেনা হলো। বাড়ি নিয়ে এসে দাদু মাকে হাসতে হাসতে বলছে, দ্যাখ ,তোর মেয়ে ববি প্রিন্ট এর কাপড় কিনেছে। সবাই এসে একবার করে বলে যাচ্ছে -কি, ববি প্রিন্ট? কই দেখি দেখি! দারুন ব্যাপার স্যাপার রিনি। আমি তো খুশিতে একদম ডগমগ। ববি প্রিন্ট বলে কথা! খোদ সিনিমার নায়িকা পরেছে, তার পরই আমি ! আমার কোদাল দাঁত আরো কোদাল এর মত উঁচু হয়ে আর ঢুকছেই না ভিতরে হিহি হাসির চোটে সারাদিন। তারপর মা ওই কাপড়টা  দিয়ে লাল বর্ডারের বেল্ট লাগিয়ে আশ্চর্য সুন্দর জামা বানিয়ে দিয়াছিল একটা। সে জামা যতদিন না বানানো হচ্ছিল এবং বানানোর পর অনেক দিন পর্যন্ত আমার সারা প্রাণ-মন-আত্মা ওই ববি প্রিন্ট এর মধ্যেই ঢুকে ছিলো। জামাটা আর নেই, কারণ আমার মাজননী আমাদের পুরনো জামাকাপড় সবই লুকিয়ে লুকিয়ে ( লুকিয়ে, কারণ আমাদের জানালে আমরা প্রাণে ধরে কোনো জামা ফেলে দিতে পারতাম না ,সব জামাগুলোর সঙ্গেই নানারকম আবেগ জড়িয়ে আছে, কোনটা পরে ভালো রেজাল্ট হয়েছে, কোনটা প্রিয় কেউ দিয়েছে- নানা কারণ; এবং ব্যাপারটা চোখের জলে শেষ হত শেষপর্যন্ত এই ভেবে ভেবে যে মা কি নিষ্ঠূর – আমাদের অনুভূতির কোনো দাম না দিয়ে লোক কে জামা গুলো দিয়ে দিলো কি করে !) লোক কে দান করে দিতেন ঘরে রাখার জায়গা নেই এই অজুহাতে। আমার সেই প্রিয় জামাও কাউকে দান করে উদ্ধার করেছেন নিশ্চয়ই! পরে জিগ্গেস করতে নির্বিকার ভাবে বলেছিলেন আমি কি করে জানবো, নিজের জামা নিজে গুছিয়ে রাখনি কেন। যেন ছোটবেলা থেকে সব জামাকাপড় আমিই গুছিয়ে রেখে আসছি কিনা !

যাইহোক,সেই শুরু আমার ববি প্রিন্ট প্রেম। বড় বেলায় বন্ধুরা সবাই হাসতো আমার ওই রকম বাচ্চাদের মতো গোল গোল পছন্দ বলে। তাতে আমায় ভারী বয়েই গেল ! বেগুনির ওপর হলুদ ,নীল এর উপর কমলা, অনেক রকম উদ্ভট রঙের কম্বিনেশন আমি পরেছি শুধুমাত্র ববি প্রিন্ট বলেই। ওই যে গোল গোল ছাপ , ঐগুলো দেখলেই আমার এমনি মজা হয়, কি বলব! এখনো। গোল গোল বুদ্বুদগুলোর মধ্যে যেন মুঠো মুঠো করে খুশি ভরা থাকে, দেখলেই দিলখুশ। এমন কি অন্যদের জামাকাপড়েও ওই রকম গোল গোল থাকলে আমি বিশেষ খুশি হই। এখন তো অনেক বড় হয়ে গিয়াছি, দুঃখ গুলো অনেক বেশি গম্ভীর,গভীর ,ছাই ছাই কালি কালি বিবর্ণ। তবু রাস্তায় কাউকে ববি প্রিন্ট শাড়ি পড়তে দেখলে ,কারো জামায় ,ওড়নায়,আঁচলে ওই গোল গোল ছাপ দেখলেই আমার সব মন খারাপ কেটে যেতে থাকে ,দুঃখগুলো ঝলমল করে বদলে যেতে থাকে খুশিতে , আর গোল গোল ববি প্রিন্ট গুলো হাসতে  হাসতে  কাপড় থেকে উড়ে উড়ে বেরিয়ে মনে মনে আমাকে নিয়ে যেতে থাকে সব পেয়েছির তাসের দেশে।

7 Comments

  1. Soma jana March 2, 2017 at 10:32 am - Reply

    সুন্দর।অসাধারন।মন জুড়ানো।

    • titlisarkar.com May 6, 2017 at 9:04 pm - Reply

      Thank you dear.

  2. Trinankur March 2, 2017 at 6:19 pm - Reply

    Nice one ….keep up the spirit

    • titlisarkar.com May 6, 2017 at 9:04 pm - Reply

      Thank you reader.

  3. Shu March 21, 2017 at 9:54 pm - Reply

    Eta porey golper onuvuti thik aslo na… Onekta sei, ‘boby print’ er opor lekha rochona type er laglo… But fresh story…

  4. Shu March 21, 2017 at 9:54 pm - Reply

    Eta porey golper onuvuti thik aslo na… Onekta sei, ‘boby print’ er opor lekha rochona type er laglo… But fresh story…….

    • titlisarkar.com May 6, 2017 at 9:03 pm - Reply

      Sorry reader. Count on next time.

Leave A Comment