তোমায় নিয়েই গল্প হোক …

/তোমায় নিয়েই গল্প হোক …
তোমায় নিয়েই গল্প হোক …2018-09-04T02:46:23+00:00

আমাদের সব মেয়ে তোমার মত সাহসিনী হোক, বিজয়িনী হোক।

                                    -পাঞ্চালীদি কে

 

 

 

 

 

 

সারাটা রাস্তা আমার বুকের মধ্যে কাঁপছিলো। খুব শান্ত হয়ে বসে ছিলাম, বাইরে থেকে যে কেউ দেখে ভাববে ধীর স্থির প্রজ্ঞাশীল বিচক্ষণ। কিন্তু আমি খুব অস্থির ছিলাম, আমার শরীর স্থির কিন্তু মনে উল্কার বেগে অসঙ্খ্য চিন্তা ছুটছে। আমি দাড়িয়ে ছিলাম অথচ ছিলাম না। এক জায়গায় স্থির হওয়া আমার খুব দরকার। অস্থিরতা আমার শরীর মনে যথেষ্ট চাপ ফেলেছে, ডাক্তার বলেছেন আমার এর পর আর কিছু করার নেই। এবার কিন্তু নিজের হাতে তোমার সেরে ওঠা। জানি না তাঁর কাছে যাওয়া আমায় শান্ত করবে কিনা, জানতে চাইও না। আশা করছি হয়ত কিছুটা পরিবর্তন হবে পরিস্থিতি। খুব ঠান্ডা পড়েছে, বাইরে ঘন কুয়াশা, কাজ ছাড়া কেউ বাইরে বেরয় না এখানে সচরাচর, সবাই ব্যস্ত, সবারই ভীষণ তাড়া। খালি আমারই মনে হচ্ছে এই  স্টেশন এ দাড়িয়ে কোনো গন্ত্যব্য নেই।

আমাকে উনি যেতে বলেছিলেন সাড়ে চারটে। এখন বাজে একটা পঁচিশ। পৌছতে বড়জোর আধাঘন্টা।  এত আগে কি ভদ্রলোকের বাড়িতে যাওয়া যায়? যায় না, কিন্তু আমি যাবো। আমার অনেক কাজ, কিন্তু রূপকে কতদিন দেখিনি। অনেক অনেক দিন পরে একসঙ্গে বেরোতে ইচ্ছে করছিলো, ভেবেছিলাম এই কনকনে ঠান্ডায় আইসক্রিম খাব। ওর সব সময় কাজ, কতদিন আমরা ভালো করে কথাই বলিনি, অভিযোগ করতেও আজকাল ক্লান্ত লাগে। ভেবেছিলাম একবার অন্তত রূপ আমায় ভুল প্রমান করুক, সব কাজ ফেলে আসুক, একদিন অন্তত রেশম স্বরে বলুক – কাজ আছে তো মিমি? কি পাগলামো করছো কান্নাকাটি? আচ্ছা সামনের রবিবার একদম পাক্কা যাবই যাব। জানি আসবে না, টাকার দাম আমার চেয়ে অনেক বেশি, তবু মিথ্যে মিথ্যে বলতে তো পারত? তার বদলে রোজকার মত আমায় ছিড়ে খুড়ে ফেলে দিলো – কেন আমার সময় নষ্ট করছ?এসব নাটক আমি একেবারে সহ্য করতে পারি না!

কাজল না পরলে আজকাল বেরোনই যাই না, চোখের নিচে গভীর কালি। এত ঘুম পাচ্ছিল ট্রেন এ আমার, বাকি রাস্তাটা হেটেই গেলাম আর অন্য কিছুতে না উঠে। রাস্তার পাশে দেখি কতগুলো পুচকে আগুন করেছে, ভীষণ অভাব, গায়ে জামা নেই, কিন্তু ভারী খুশি। আর খুশিটা  এমন একটা অদ্ভুত ব্যপার, এমনি এমনি ই ছড়িয়ে যায়। আমার ও ভালো লাগতে শুরু করলো খুব একটুখানি।

তারপর দেখলাম তোমায়, গেলাম একজন এর কাছে ,দেখলাম অন্য একজন কে। ওনার কাছে যাবার আপাতদৃষ্টিতে কোনোই কারণ ছিল না আমার, আমায় চেনেনও না উনি, কত বড় মাপের মানুষ, কথাই বলবার কথা নই আমার সঙ্গে, কিন্তু যেই বললেন চলে আয় ‘মা’, ভারী ভালো লাগলো। আর ওখানে গিয়ে দেখলাম তোমায়, সব জ্বালা জুড়িয়ে। জলপ্রপাত এর মত সহজ অথচ ইস্পাত এর মত কঠিন। ওনার ঘরে বিরাট ধ্যান মুগ্ধ বুদ্ধের ছবির সামনে তুমি এসে দাঁড়ালে, হাতে মাটির ধুনুচি থেকে ধোঁয়া উঠছে, অস্থির ভাবে ওনাকে জিজ্ঞেস করছ কি যেন দেবে ওর মধ্যে – ছেলেমানুষী। উনি হেসে বললেন এই দেখো এই সে – অমনি আমার চোখে জল এলো। আমার ঝাপসা হয়ে যাওয়া দৃষ্টিতে তোমার পেছনের ওই বুদ্ধের নিমীলিত প্রশান্ত মুখ মিশে যাচ্ছে তোমার মুখে, তোমার গা থেকে চন্দনের সুঘ্রান আসছে, মনে হলো আমার দেবী দর্শন হলো। চারিপাশে কথা হচ্ছিল আমি শুনতে পাচ্ছিলাম না আর, তোমার মাখন পেলব ত্বক দেখছিলাম আর মনে হচ্ছিল এত স্নিগ্ধ মায়াবী একজন মানুষ এত ঝড় ঝাপ্টা হাসিমুখে সামলান কি করে! ওনার কন্যাসমা তুমি কি অপরিসীম ধ্যর্য আর মমতায় আগলে রেখেছ ওনার সব সৃষ্টি ,জীবন ,ঘর গেরস্থালির সবটুকু। কি দুঃসাহস তোমার ,কেমন করে ছেড়ে আসলে সব হাসিমুখে,দুর্দান্ত কেরিয়ার ,অর্থ ,বিত্ত ,যশ ?সমাজ এর ছিটিয়ে দেওয়া সব কালি কোন জাদুতে বদলে দিয়েছ নিষ্ঠা আর ভালোবাসার রঙে? ক্যানভাস এর বুদ্ধের মুখে যন্ত্রণার ভাঙ্গাচোরার ফাটল ,আর ঠোঁটের  উপর কোমল একটা গোলাপ এর পাপড়ি। বুদ্ধ না তুমি? সূর্যের কাঠিন্য এসে মিলেছে চন্দ্রের কোমলতায় ,বাইরে থেকে আঘাত করা ছুরির দাগ মুখ লুকিয়াছে তোমার দাগহীন মোম ত্বকে।কোনো অভিযোগ নেই ,গ্লানি নেই ,কালিমা নেই – আমি কোনো কথা বলতে পারছিলাম না তোমাকে দেখতে দেখতে,বাকরূদ্ধ একেবারে । আমার খুব ইচ্ছে করছিল তোমার সঙ্গে কথা বলতে অনেকক্ষণ ,হয়তো অপরিচয় এর বাধা কাটিয়া কথা বলতে তোমার ও অসুবিধা হচ্ছিল প্রথম দিন।

সময় এর হাতে তো আমরা সবাই বন্দী। অগত্যা উঠতেই হয়। কিন্তু আমাকে তুমি আজ বাঁচিয়ে দিলে মেয়ে জানো, কেমন করে যেন নিজের অজান্তেই। আমার জীবনের সব অপমান সব অপূর্ণতার গ্লানির মেঘ একটু একটু করে কেটে যাচ্ছে প্রায় – ফেরার সময় আবিষ্কার করলাম। তুমি এত অনায়াসে এত গুরুভার সামলাতে পারলে আমিই বা পারব না কেন? কত অনায়াসে জয় করা যায় উপেক্ষা! চারপাশে সবকিছুই ভারি সুন্দর লাগতে থাকছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম শান্তির প্রলেপ লাগছে বুকে। আমার আজ তোমায় নিয়ে উতসব। আমাদের সব মেয়ে তোমার মত সাহসিনী হোক, বিজয়িনী হোক।